জামাতে ইসলামী সহ ইসলামিক দলগুলোর ১১ জোটে—কৌশলী জামাত লাভবান নাকি অন্যরা লাভবান?
সাম্প্রতিক নির্বাচন ঘিরে ইসলামিক দলগুলোর জোট রাজনীতি এখন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে। বিশেষ করে ঢাকা-৬, ঢাকা-৭ ও গাইবান্ধা-৪ আসন নিয়ে জামাতে ইসলামী হাইকোর্টে মামলা করার পর আদালতের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ব্যালট পেপার, রেজাল্ট শিটসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। মাঠের আলোচনায় অনেকেই বলছেন—আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এই তিন আসনে ফলাফলের পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়ও। ইসলামিক দলগুলোর ১১ দলীয় জোট গঠন, পরে তা ভেঙে ১০ দলে রূপ নেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়া কি কৌশলগতভাবে একপাক্ষিক সুবিধা তৈরি করেছে? শরিক দলগুলোকে হাতেগোনা কয়েকটি আসন ছেড়ে দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই আসনগুলোতে কতটা আন্তরিক সহযোগিতা ছিল—তা নিয়ে এখন জোর প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে।
ঢাকা-১৩ আসন এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এটি ছিল শরিক দলের নেতা মামুনুল হকের জন্য নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ আসন। ভোটের হিসাব ঘেঁটে অনেকেই বলছেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পড়া ৬০০-এর বেশি ভোট জোটগত সমঝোতা অনুযায়ী রিকশা প্রতীকে ট্রান্সফার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল উল্টো। ফলাফল—আমিনুল হক দুই হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত। এই ব্যবধানকে “স্বাভাবিক রাজনৈতিক হার” হিসেবে না দেখে অনেকেই দেখছেন সমন্বয়হীনতার স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে।
অভিযোগ আরও গভীর। নির্বাচনের আগে ও পরে জামাতে ইসলামীর পক্ষ থেকে মামুনুল হকের প্রতি দৃশ্যমান ও শক্তিশালী সাংগঠনিক সাপোর্ট ছিল না—এমন কথা শরিক মহলেই ঘুরছে। আইনি লড়াইয়েও প্রত্যাশিত সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজের প্রসঙ্গ টেনে অনেকে বলছেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হলে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের পর্যবেক্ষণ—এই জোটে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভ তুলেছে জামাতে ইসলামী। তাদের যুক্তি, এককভাবে নির্বাচনে গেলে জামাতের পক্ষে এতগুলো আসনে প্রভাব তৈরি করা কঠিন হতো। কিন্তু জোটের ছায়ায় তারা সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।
এদিকে বিকল্প রাজনৈতিক হিসাবও আলোচনায়। অনেকের বক্তব্য, যদি মামুনুল হক বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতায় যেতেন, তাহলে একাধিক আসন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল; এমনকি নির্বাচিত হলে মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়ার পথও খুলতে পারত—এমন কথাও রাজনৈতিক অন্দরে শোনা যাচ্ছে।
চরমোনাই পীর সাহেবের জোট ত্যাগের সিদ্ধান্তও নতুন করে মূল্যায়নের টেবিলে এসেছে। কেউ বলছেন এটি ছিল দূরদর্শী পদক্ষেপ, আবার কেউ দেখছেন বাস্তব রাজনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর আলোচনা হচ্ছে কওমি ঘরানার আলেম সমাজকে ঘিরে। সমালোচকদের অভিযোগ—জামাতে ইসলামী প্রয়োজনে এই ধারার আলেমদের কাছে টানে, আবার রাজনৈতিক প্রয়োজন ফুরালেই দূরত্ব তৈরি করে। এবারের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে অনেকের কাছে আরও জোরালো করেছে। তবে জামাত সমর্থকরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আরও ধারালো—১১ দলীয় ইসলামিক জোটে প্রকৃত লাভবান কে? জামাতে ইসলামী, নাকি তাদের শরিকরা?
জনমতের বড় অংশ মনে করছে, টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য জোট রাজনীতি গড়তে হলে কেবল আসন বণ্টন নয়, দরকার আন্তরিক মাঠসমন্বয়, সমান আইনি সহায়তা এবং পারস্পরিক আস্থার বাস্তব প্রমাণ। অন্যথায় জোট থাকবে কাগজে—কিন্তু আস্থার ঘাটতি থেকেই যাবে মাঠে।
Leave a Reply